জান্নাত ও জাহান্নামের পরিচয় এবং সুখ-শাস্তির বিবরণ

Feature Image

বিচারে পর আল্লাহ তাআলা নেককার (ভালো) বান্দাকে জান্নাত এবং বদকার (মন্দ) বান্দাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। আর যারা বিচারে সাময়িকভাবে কিছু শাস্তি ভোগের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে তাদেরকেও গুনাহের শাস্তি প্রদান করার পর আল্লাহ তাআলা জান্নাত দান করবেন। জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য এবং আল্লাহ তাআলা পূর্বেই তা সৃষ্টি করে রেখেছেন। কুরআন ও হাদিসে এর স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। (শরহু আকাইদিন ন্যাসাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-৯৬-৯৮; আল মুরশিদুল আমিন, পৃষ্ঠা-৩২-৩৩)

কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে চলে তাদের জন্য জান্নাতসমূহ রয়েছে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হয়, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, তাদের জন্য পবিত্র সঙ্গিনী এবং আল্লাহর নিকট হতে সন্তুষ্টি রয়েছে, আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত। (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫)

জান্নাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে যে নিয়ামত দান করবেন এ সম্পর্কে কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, এই দিন জান্নাতবাসীগণ আনন্দে মগ্ন থাকবে, তারা এবং তাদের সঙ্গিনীগণ সুশীতল ছায়ায় সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে থাকবে তাদের জন্য ফলমূল এবং তাদের জন্য বাঞ্ছিত সবকিছু। পরম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ হতে তাদেরকে বলা হবে সালাম। (সূরা ইয়াসীন, ৩৬ : ৫৫-৫৯)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, মুত্তাকিদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত, এতে আছে নির্মল পানির নহর, আছে দুধের নহর, যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহর, আছে পরিশোধিত মধুর নহর এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে বিবিধ ফলমূল ও তাদের প্রতিপালকের ক্ষমা। (সূরা মুহাম্মদ, ৪৭ : ১৫)

হজরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য (জান্নাতে) এমন নিয়ামতসমূহ প্রস্তুত রেখেছি যা চোখ দেখেনি, কান শুনেনি এবং যা মানুষের অন্তরে কল্পনায়ও আসেনি। (মিশকাত শরিফ, ২য় খ-, পৃষ্ঠা-৪৯৫)

অপর এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমাদেরকে যে নিয়ামতসমূহ প্রদান করা হয়েছে তা থেকে আরো অতিরিক্ত আরো কিছু তোমাদেরকে প্রদান করবো কি? উত্তরে তারা বলবে, আপনি কি আমাদের মুখমন্ডল উজ্জ্বল করেননি, আমাদেরকে জান্নাতে দাখিল করেননি এবং আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি? রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, এ সময় পর্দা সরিয়ে দেওয়া হবে, তখন তারা তাঁর (কুদরতি) দীদার লাভ করবে। জান্নাতীদের জন্য আল্লাহর দীদারই হবে সর্বোত্তম নিয়ামত। তারপর তিনি- যারা মঙ্গলজনক কাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে মঙ্গল এবং আরো অধিক। (সূরা ইউনুস, ১০ : ২৬) এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। (মিশকাত শরিফ, ২য় খ-, পৃষ্ঠা-৫০০)

হজরত আবূ সাঈদ এবং আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, (জান্নাতি লোকেরা জান্নাতে যাওয়ার পর) কোনো একজন ঘোষণাকারী এ মর্মে ঘোষণা করবেন যে, এখন থেকে চিরকাল তোমরা সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। এখন থেকে চিরকাল জীবিত থাকবে, তোমাদের জন্য আর মৃত্যু নেই। তোমরা সর্বদাই যুবক থাকবে, কখনো বৃদ্ধ হবে না। আর এখন থেকে তোমরা সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করবে। কোনোরূপ দুঃখ কষ্ট ভোগ করবে না। (মিশকাত শরিফ, ২য় খ-, পৃষ্ঠা-৪৯৬)

জাহান্নামিদের সম্পর্কে কুরআন এবং হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, যারা কুফরি ও আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে তারাই জাহান্নামি, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। (সূরা বাকারা, ২ : ৩৯)

জাহান্নামের শাস্তি প্রসঙ্গে অপর এক আয়াতে উল্লেখ রয়েছে, যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে, অগ্নি তাদের মুখমন্ডল দগ্ধ করবে এবং সেখানে তারা থাকবে বীভৎস চেহারায়। (সূরা মুমিনূন, ২৩ : ১০৩-৪)

অন্য আয়াতে আরো ইরশাদ হয়েছে, যারা কুফরি করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক, তাদের মাথার উপর ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি, এর দ্বারা তাদের পেটে যা আছে তা এবং তাদের চামড়া বিগলিত করা হবে এবং তাদের জন্য থাকবে লৌহ মুদগর। যখনই তারা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে তখনই তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে তাতে, আর তাদেরকে বলা হবে, আস্বাদ কর দহন যন্ত্রণা। (সূরা হাজ্জ, ২২ : ১৯-২২)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, যারা আমার আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে অগ্নিতে দগ্ধ করবোই, যখনই তাদের চর্ম দগ্ধ হবে তখনই এর স্থলে নতুন চর্ম সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিসা, ৪ : ৫৬)

জাহান্নামের শাস্তির কথা আলোচনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, জাহান্নামিদের মধ্যে যে ব্যক্তির আজাব সবচেয়ে সহজ এবং কম হবে তার পায়ে জাহান্নামের দুটি জুতা ও ফিতা পরিয়ে দেওয়া হবে। আর এ অগ্নি জুতার তাপ এত প্রচণ্ড হবে যে, চুলার উপর হাড়ির পানি যেভাবে ফুটতে থাকে ঐ ভাবে তার মস্তিষ্কও ফুটতে থাকবে। তার আজাবকে সর্বাধিক কঠিন আজাব বলে ধারণা করা হবে অথচ তার আজাব হলো সবচেয়ে কম ও হালকা। (মিশকাত শরিফ, ২য় খ-, পৃষ্ঠা-৫০২)

জাহান্নামিদের পানাহারের জন্য যে সব জিনিস সরবরাহ করা হবে সে প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, জাহান্নামিদের পান করার জন্য যে পুঁজ দেওয়া হবে এর এক পাতিল যদি দুনিয়াতে নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে গোটা দুনিয়াবাসী দুর্গন্ধে মারা যাবে। (মিশকাত শরিফ, ২য় খ-, পৃষ্ঠা-৫০৩)

জাহান্নামিদের পানাহারের ব্যাপারে আরো বলা হয়েছে যে, তাদেরকে যাক্কুম বৃক্ষের ফল খেতে দেওয়া হবে। আর যাক্কুম বৃক্ষের আলোচনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, যদি যাক্কুমের এক ফোঁটা দুনিয়ায় পড়ে তবে দুনিয়াবাসীর সকল পানাহার দ্রব্য বিনষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে যাকে এ যাক্কুম পান করাতে দেওয়া হবে তার কী অবস্থা হবে? (মিশকাত শরিফ, ২য় খ-, পৃষ্ঠা-৫০৩)

Loading...

আরো খবর »