এক্সক্লুসিভ সংবাদ »

বঙ্গবন্ধুকে যারা স্বীকার করে না তারা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হবেন

Feature Image

খ.ম. বশির উদ্দিন : শুধু নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করলে হবে না। খেলোয়াড় এবং সমর্থকরা যদি বন্দুক-বোমা, দা-কুড়াল নিয়ে মাঠে নামেন, তাহলে নিরপেক্ষ আম্পায়ার কি করবেন? সুতরাং সুস্থধারার বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অসাম্প্রদায়িক জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এজন্য কিছু ‘জাতীয় রাজনৈতিক নীতিমালা’ সাংবিধানিকভাবে বিধান করে দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির দপ্তরে দাখিলকৃত বাংলাদেশ মানবতাবাদী দলের (বিএইচপি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ও মহাসচিব ড. সুফি সাগর সামস্ স্বাক্ষরিত ইসি গঠনে তাঁদের দলের ৪টি মূল প্রস্তাবনার প্রথম প্রস্তাবনায় এসব কথা বলা হয়েছে।

 

প্রস্তাবনায় বিএইচপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান আরো বলেন, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে দুটি মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলেন তা হলো :

 

১. বাঙালি জাতির স্বাধীনতা।

২. অর্থনৈতিক মুক্তি।

এ দুটি লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি ধাপে ধাপে আন্দালন-সংগ্রম করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তিসংগ্রামে অভূতপূর্ব ও অভাবনীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ, উজ্জীবিত ও উদ্বেলিত করেছিলেন। এরই আলোকে তিনি জনগণের কাছে ‘ছয় দফা’ মুক্তির সনদ তুলে ধরেন। এ ছয় দফা বীজ থেকেই অঙ্কুরিত হয় বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ১৯৭১ সালে এ চেতনাকে বুকে ধারণ করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। বঙ্গবন্ধুর দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি লাভ করে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং স্বাধীন ভূখন্ড।

বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রথম লক্ষ্য ‘স্বাধীনতা’ লাভের পর দ্বিতীয় লক্ষ্য ‘অর্থনৈতিক মুক্তি’র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা তাঁকে ধরে রাখতে পারিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমাদেরকে এতিম হতে হয়েছে। তাঁকে তাঁর পরিবার-পরিজনসহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে আমরা বিপথগামী হয়েছি। আমরা আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়েছি। আমরা অর্থনৈতিক মুক্তির গণতান্ত্রিক রাজনীতির নামে আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত হয়েছি। হিংসা-প্রতিহিংসার অনলে জ্বলে-পুড়ে মরছি।

জনগণের ক্ষমতায়ণ ধারার প্রবীন এ লেখক ও রাজনীতিবিদ আরো বলেন, শুধু মধ্যম আয়ের দেশ নয়, বাংলাদেশ হবে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও ধনী রাষ্ট্র। এজন্য আমাদেরকে হিংসা-প্রতিহিংসার রাজনৈতিক অনল হতে মুক্ত হতে হবে। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় লক্ষ্য ‘অর্থনৈতিক মুক্তি’র রাজনীতিতে লিপ্ত হতে হবে। এজন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য কিছু নীতিমালা সাংবিধানিকভাবে বিধান করে দিতে হবে। যাতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ওই নীতিমালাসমূহ আমাদের প্রত্যেখটি রাজনৈতিক মানতে বাধ্য হয়।

 

জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য যে রাজনৈতিক নীতিমালা সাংবিধানিকভাবে বিধান করতে বিএইচপি তাদের প্রস্তাবনায় তুলে ধরেন তা নি¤œরূপ :

১. দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও দলের নেতৃত্ব গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কর্মসুচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মত-পার্থক্য নিয়ে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুকে বিভাজন করা যাবে না।

২. বাংলাদেশের রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হতে হবে বঙ্গবন্ধুর ‘অর্থনৈতিক মুক্তির’ রাজনীতি।

৩. স্বাধীনতার জন্য ‘জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, একইভাবে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সকল শেণিপেশার জনগণকে।

৪. রাজনীতি করতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকার করার মধ্য দিয়ে। বিশ্বের কাছে ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ’ আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব। ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ’ এক ও অভিন্ন একটি সত্ত্বা।

৫. বঙ্গবন্ধুকে যাঁরা স্বীকার করবে না তাঁরা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হবেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার থাকতে পারে না। সাংবিধানিকভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার অধিকার স্থগিত করে দিতে হবে।

৬. ‘অর্থনৈতিক মুক্তি’ অর্জনের জন্য রাজনীতি করতে হবে। রাজনীতির নামে জনগণকে হিংসা-প্রতিহিংসায় লিপ্ত করা যাবে না।

 

৭. অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন মত-পার্থক্য এবং বিভিন্নতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। জাতীয় সংসদে সরকারী ও বিরোধীদল অবস্থানগ্রহণ করবেন অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁদের মত-পার্থক্যের বিষয়বস্তু নিয়ে।

৮. যেমন, ভারতে ‘কংগ্রেস এবং বিজেপি’। তাঁদের জাতির পিতা মহাত্মাগান্ধীর প্রশ্নে তাঁদের কোনো দ্বিমত নেই। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁদের বিভিন্ন মত-দ্বিমত আছে। এ মত-দ্বিমতকে কেন্দ্র করেই সেখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে। তাঁরা কেউ তাঁদের দেশের স্বাধীনতাবিরোধী নয়। তাঁদের যে বিভাজন রয়েছে তা হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসুচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা নিয়ে।

৯. একইভাবে ব্রিটেনে ‘লেবার পার্টি ও কনজার্ভ্যাটিভ পার্টি, যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টি ও ডেমোক্রেটিক পার্টি’র রাজনৈতিক সংস্কৃতি। তাঁদের রাজনীতিও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও তাঁদের নাগরিকদের সুখ-সমৃদ্ধিকে কেন্দ্র করেই বিরাজমান রয়েছে। এছাড়া রাশিয়া, চীন, জাপান, জার্মানী, ফ্রান্স ইটালিসহ পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করেই। সেখানে হিংসা-প্রতিহিংসা ও আত্মপ্রবঞ্চনার কোনো স্থান নেই।

প্রথম প্রস্তাবনার শেষ অংশে বিএইচপি’র চেয়ারম্যান অসাদুজ্জামান বলেন, আমাদেরকে বিশ্ব রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হিংসা-প্রতিহিংসার অনলে পুড়ে মরলে হবে না। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গবন্ধু কিংবা জাতির জনক’ বলে স্বীকার করেন না। তাঁরা শুধু ‘শেখ মুজিব’ বলে সম্বোধন করেন। তাঁদের আচরণ এবং কথায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন অশ্রদ্ধা রয়েছে, যেন বঙ্গবন্ধু তাঁদের দুশমন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁদের কিসের দুশমনী? বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তো বিএনপির জন্মই হয়নি। তাহলে তাঁর সাথে বিএনপির শত্রুতা সৃষ্টি হলো কীভাবে? বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করে “জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ কথায় কারো কোনো দ্বিমত নেই। তাহলে জিয়াউর রহমানের অনুসারী বিএনপির নেতাকর্মীরা “জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিতে দ্বিধা করেন কেন? কেন তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে অশ্রদ্ধা করেন? বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করে বিএনপির রাজনীতি করা উচিৎ। অন্যথায় জনগণ তাঁদেরকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে তিরস্কার করবে। যদিও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভুষিত করেছিলেন।

 

বিএইচপি’র মহাসচিব ড. সুফি সাগর সামস্ জানান, ইসি গঠনে বাংলাদেশ মানবতাবাদী দলের ৪টি মূল প্রস্তাবনার প্রথম প্রস্তাবটি আমাদের শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের বর্তমান যুগোপযোগী রাজনৈতিক ভাবনা। আমাদের চেয়ারম্যান রাজনৈতিক সংঘাত দেখতে চান না, তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জাতীয় ঐক্য চান। তাঁর প্রস্তাবিত ‘জাতীয় রাজনৈতিক নীতিমালা’র প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে দেশে বিদ্যমান হিংসা-প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান হবে।

আরো খবর »